ভারত কি যুক্তরাষ্ট্রের তাঁবেদার হবে?

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত | 2017/02/05 | 13:29

ভারত স্বাধীনতার পরে কি এবার আমেরিকার তাঁবেদার হয়ে চলবে? প্রশ্নটি এখন সারা ভারতের সব মহলে ঘোরাফেরা করছে। ১৯৪৭ সালে যখন ভারত স্বাধীন হয় তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান বারবার জওহরলাল নেহরুর কাছে বার্তা পাঠান, “আপনারা আমাদের জোটে আসুন। আমরা ভারত পুনর্গঠনের জন্য প্রচুর সাহায্য করব।”

এরপরই ভারত উদ্যোগ নেয় নির্জোট আন্দোলনের। নেহরুর পাশে সেদিন ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্ণ, মিশরের প্রেসিডেন্ট নামের, যুগোশ্লাভ প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো, চীনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই প্রমুখ। আর এই নির্জোট আন্দোলনের সদস্য সংখ্যা বিশ্বের ১৯৩টি দেশ। নির্জোট আন্দোলনে এই প্রথম গত বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী যোগ দেননি।

নেহরুর উদ্যোগেই আফ্রিকার দেশগুলিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। ভারতের ঘোষিত বিদেশনীতি হল, সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আস্থা ও সহনশীলতা। মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় আগে প্রায় ১৫ বছর আমেরিকায় বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে আর এসএম প্রচারক হিসেবে কাজ করেছেন। সেসময় বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। হোয়াইট হাউজ থেকে দিল্লির সাত নম্বর রেসকোর্স রোডের বাসভবনে কী কথা হয়েছে, তার নির্যাস হল, ভারত আমেরিকার তাঁবেদারি করবে।

গত শতকের ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমেরিকা বাংলাদেশের মাটিতে ৩০ লক্ষ লোকের হত্যার সমর্থন জানিয়েছিল। তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আমেরিকাকে মূর্খের মতো জবাব দিয়েছিলেন।

ট্রাম্প চাইছেন দক্ষিণ এশিয়ায় তাঁর প্রভাব বিস্তার করতে। সঙ্গী হিসেবে চাইছেন গুজরাটের আরেক ব্যবসায়ী নরেন্দ্র মোদিকে। ওয়াশিংটনের ট্রাম্প এবং দিল্পীর মোদি সাহেব তাদের নিজ নিজ ধর্মে বিশ্বাসী, তা অটুট রেখেই তাঁরা ভিন্ন ধর্মের লোকদের প্রতি অবহেলা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে পৃথক করতে। গোটা বিশ্বে গত কয়েক দশক ধরে ছোট ছোট দেশে সাম্রাজ্যবাদসহ ধর্মীয় বিরোধ দানা বেঁধেছে, তার পেছনেও এই আমেরিকা।

দীর্ঘকাল সাংবাদিকতা জীবনে কখনও আমরা দেখিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট শপথ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সদর দপ্তরে হাজির হন। আর পৃথিবীর সব দেশেই নেপথ্যে ষড়ন্ত্রকারী সিআইএ। এই সিআইএর সঙ্গে তার কী শলাপরামর্শ হয়েছে, তা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। এর পরিণাম যে মারাত্মক হতে পারে তা বোঝা যাচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, সেন্ট্রাল এশিয়ার বহু দেশে সিআইএর কার্যকলাপ সুবিদিত।

একের পর এক রাষ্ট্রনেতাদের খুন করে সিআইএ মদদপুষ্ট নেতাদের ক্ষমতায় বসিয়েছে। প্রেসিডেন্ট পদে বসেই প্রথমে দুই প্রতিবেশী মেক্সিকো ও কাসাভার প্রেসিডেন্টকে ফোন করেন ট্রাম্প। পরদিন ফোন করেন ইসরায়েল ও মিশরের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে। পাঁচ নম্বর ফোনটি আসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাশিয়া, চীন, জাপান বা ইউরোপের অন্য কোনো দেশের প্রধানদের ফোন করার আগেই নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রীতিমতো তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা। আসলে তিনি চাইছেন, প্রথম থেকেই ভারতের সঙ্গে একটা বিশেষ সম্পর্ক তৈরি করতে বিশেষ করে, চীনের সঙ্গে সম্পর্কেও ভারতকে কাজে লাগাতে চান ডোনান্ড ট্রাম্প।

মধ্যরাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে কথা হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। সূত্র নাকি জানিয়েছে, রাশিয়া, চীন এবং জাপানের আগে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দিতে চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেই কারণে প্রেসিডেন্ট পদে শপথ নেওয়ার পর প্রথম যে পাঁচটি টেলিফোন কল করেছেন তিনি তাঁর মধ্যে একটি নরেন্দ্র মোদির। প্রধানমন্ত্রী তাঁকে বলেছেন, এদেশের বাজারে মার্কিন পণ্য অবাধে বিক্রি করার জন্য প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমেরিকাকে বেশ কিছু সুযোগসুবিধা দিতেও প্রস্তুত ভারত। শুধু বাণিজ্য সম্পর্ক নয়, বিদেশ নীতির ক্ষেত্রেও ‘আমেরিকার শত্রু আমার শত্রু’– এই নীতিতে চলতে চায় ভারত।

দুই রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা নিয়ে দীর্ঘ কথা হয়েছে। নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদকে মদদ দেওয়ার যাবতীয় অভিযোগ করেন। ট্রাম্প বলেন, এসব অভিযোগ সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি সুপারিশ করবেন বলেও জানান। প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ভারতে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ট্রাম্পও প্রধানমন্ত্রীকে আমেরিকায় যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান।

ওয়াকিবহাল মহলের বক্তব্য, ট্রাম্প চাইছেন ভারতকে সঙ্গে নিয়ে চীনবিরোধী ব্যাপক অভিযান চালাতে। নির্বাচিত হওয়ার আগেই ট্রাম্প তাঁর বিভিন্ন ভাষণে চীনকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন বিশেষ করে, দক্ষিণ সাগর অঞ্চলে চীনের প্রভাব মুক্ত করে অবাধ বাণিজ্য চালু করার জন্য তিনি ভারতের ওপর অনেকটাই নির্ভর করেন বলে জানিয়েছেন। এ জন্য আগামীদিনে ভারত-মার্কিন যৌথ সেনা মহড়া আরও অনেক বাড়বে বলে অনুমান। ভারত যে আমেরিকার বিশেষ নীতির সঙ্গে একেবারে তাল মিলিয়ে চলার জন্য প্রস্তুত তা সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে জানিয়ে দিয়েছেন মোদি।

এদিকে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন একের পর এক সেসব পদক্ষেপ বাতিল করে দিচ্ছেন ডোনান্ড ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য, মার্কিন স্বার্থেই কড়া পদক্ষেপ নিতে তিনি বাধ্য হলেন। ওবামা কেয়ার বা বারাক ওবামার আমলে স্বাস্থ্যবীমা প্রকল্পকে তিনি প্রথমেই বাতিল করেছিলেন। এরপর বাতিল করেন ‘ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ’ বা টিপিপি। যদিও ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, ওবামা কেয়ারকে তিনি পুরোপুরি তুলে দিতে চান না, বরং এর বিকল্প একটি প্রস্তাব তিনি মার্কিন কংগ্রেসে পেশ করতে চান।

২০১৫ সালের টিপিপি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে অস্ট্রেলিয়া, জাপান, চিলি, মেক্সিকো, নিউজিল্যান্ডসহ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মোট ১২ দেশ। এই চুক্তিতে এই দেশগুলির মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বিস্তারে নানা সুবিধার কথা বলা হয়। চুক্তিটি ঘিরে প্রথম থেকেই নানা রকম বিতর্ক দানা বাঁধছিল। বিরোধীরা জানিয়েছিলেন, বহুজাতিকদের সুবিধা করে দেওয়ার জন্য এই চুক্তি করা হয়েছে। ভোটের প্রচারে নেমে ঠিক এ কথাই বলেছিলেন ট্রাম্প।

ট্রাম্প বলেন, “আমার কাছে আমেরিকার স্বার্থই আগে। মার্কিন শ্রমিকদের কথা ভেবেই তাই ভয়াবহ এই চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।”

ট্রাম্প জানিয়ে দেন মুক্ত বাণিজ্য নয়, তাঁর লক্ষ্য ন্যায্য বাণিজ্যে। আমেরিকার স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে কোনো পদক্ষেপ তিনি নেবেন না– এ কথাও স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন। টিপিপি চুক্তি বাতিলের পর তিনি বলেন, “ওসব বাড়তি সুবিধার মোহ নয়; যারা আমাদের সঙ্গে ন্যায্য পথে বাণিজ্য চালাবে আমরা তাদের পাশে থাকব।”

 

সুখরঞ্জন দাশগুপ্তআনন্দবাজার পত্রিকার সাবেক বিশেষ প্রতিনিধি; কলামিস্ট

READ : 713 times

এইদিনে