একটা পৃথিবী চাই মায়ের আঁচলের মতো

ক্রীড়া ডেস্ক | 2017/05/14 | 06:28

মায়ের চেয়ে আপন কেউ নয়। তিনি আপনার মা, আমার মা, অথবা সাকিব আল হাসানের মা-ই হন না কেন। পৃথিবীতে সম্ভবত এই একটা জায়গায় কোনো দ্বিতীয়, তৃতীয় নেই। সব মা-ই প্রথম। সব মা-ই বিশ্বের সেরা মা।

সাকিবকে বলা হলো মা দিবস উপলক্ষে মাকে নিয়ে একটা লেখা হবে। লেখার উপজীব্য খোঁজা হবে তাঁর সঙ্গে কথা বলে। মানে সাকিব মা সম্পর্কে বলবেন। কেন তাঁর মা-ই সেরা মা, তিনি কেমন, আজকের সাকিব আল হাসানের পেছনে মায়ের ভূমিকা ইত্যাদি নিয়ে।

প্রথমে মনে হয়েছিল সাকিবের জন্য এটা কঠিন কোনো কাজ হবে না। কারণ জীবনের অনেকটা জুড়ে শুধু মায়েরই বিচরণ। কিন্তু ঘটল উল্টো ঘটনা। কথা বলার বিষয়বস্তু শুনে সাকিব পড়ে গেলেন মহাসংকটে, ‘মাকে নিয়ে আবার কী বলব! মাকে মূল্যায়ন করব কীভাবে? তাঁর তুলনা তো কিছুর সঙ্গেই হয় না। এটা শুধু অনুভব করা যায়।’

এমন অনুভবের অনুবাদ সব সময় সঠিক ভাষা পাবে না, এটাই স্বাভাবিক। মা সম্পর্কে বলতে গিয়ে সাকিব শুধু বলতে পারলেন, ‘আম্মা অনেক কোমল হৃদয়ের মানুষ, এটুকু বলতে পারি। অনেক বেশি নরম। অনেক বেশি আবেগী।’ কথা এগোয়, কিন্তু একটু পরপরই থমকে দাঁড়াতে হয় সাকিবকে। কী বলবেন? কোথা থেকে শুরু, কোথায়ই বা শেষ! এক বেলা, এক দিন কিংবা এক জীবনেও কি শেষ হয় মাকে নিয়ে বলা?

বাবা মাসরুর রেজার কল্পনাতেও ছিল না ছেলে খেলোয়াড় হবেন। খেলা আবার কী! মানুষের মতো মানুষ হতে হলে পড়ালেখা করতে হবে, আরও অনেক বাবার মতো সাকিবের বাবার কাছেও এটাই সত্যি ছিল। খেলাধুলায় সাকিব প্রথম বাধাটা তাই পেতেন বাবার কাছ থেকেই। রেগেমেগে কতবার যে তিনি ব্যাট কেটে ফেলেছেন, সেটা এখন সাকিবও মনে করতে পারেন না।

ছেলে খেলোয়াড় হবেন, মা শিরিন আক্তারও তখন ভাবেননি। পড়াশোনার বাইরে সন্তানের আর কোনো উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখেননি তিনিও। কিন্তু মায়ের মন তো! ছেলে যখন খেলতে যেতে চাইতেন, বাবার চোখের আড়ালে এই মা-ই দেখিয়ে দিতেন পথ। যেদিন ঘরে ফিরতে দেরি হতো, খেলার জন্য স্কুল কামাই যেত—বাবার মারের হাত থেকে মায়ের স্নেহই তাকে বাঁচাত। মায়ের কথা বলতে বলতে সাকিব ফিরে গেলেন সেই সময়ে, যখন ওই আঁচলই ছিল সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল, ‘আব্বু অত খেলতে দিতে চাইতেন না। পড়ালেখার জন্য বেশি চাপ দিতেন। লুকিয়ে লুকিয়ে যখন খেলতে যেতাম, আম্মা সব সময়ই জানতেন। খেলতে যেতে চাইলে কখনো বাধা দেননি। আমি লুকিয়ে খেলতে গেলেও আম্মার কাছে সেটা লুকানো থাকত না।’ কথা বলতে বলতে স্মৃতির আরও অতলে হারিয়ে যান সাকিব, ‘ওই সময় আম্মা আমাকে প্রতিটা ক্ষেত্রে বাঁচাতেন। আব্বুর মারের হাত থেকে বাঁচানো ছিল প্রতিদিনের কাহিনি। খেলতে যাওয়া থেকে শুরু করে, টিচারের কাছে যাওয়া, স্কুল ফাঁকি দিছি কি না, ঘরে সময়মতো ফিরছি কি না—সবকিছুতে আব্বার নজরদারি ছিল, আর আম্মা সবকিছুতেই আমাকে বাঁচাতেন। কোনো দিক দিয়ে উল্টাপাল্টা হলে দেখা যেত আব্বু রাগ করছেন বা আমাকে মারারই চিন্তা করছেন। আম্মা এসব সামলাতেন।’

না, শিরিন আক্তার এমন কোনো ক্রিকেট দূরদর্শী মানুষ ছিলেন না যে সন্তানের শৈশব-কৈশোরেই তাঁর মধ্যে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের ছবি দেখে ফেলেছিলেন। সাকিবকে তিনি ওই প্রশ্রয়টুকু দিতেন কারণ, তিনি তো মা। খেলতে না পারলে ছেলে মন খারাপ করে ঘরে বসে থাকবেন, সেটা হয়তো মায়ের মনটাকেও আঁধার করে রাখত। কিংবা স্বামীর নিষেধ সত্ত্বেও মাঠে যাওয়ার উপায় বের করে দিলে ছেলের মুখে যে খুশির আভা ছড়িয়ে পড়ত, সেটি দেখার জন্য। অথবা এমনিতেই…শুধুই ছেলের বায়না পূরণ করতে। সাকিবের নিজের ধারণাও অনেকটা সে রকম, ‘ছোটবেলা থেকে আমার আবদার আম্মার কাছেই বেশি। আমার কোনো আবদার আম্মা কখনো ফিরিয়ে দেননি। তাঁর সঙ্গে সবকিছু শেয়ার করতাম, সব বলতাম। বেশির ভাগ সময় আম্মার সঙ্গে থাকতাম। ঘনিষ্ঠ ছিলাম বেশি আম্মার। আম্মাও মনে হয় আমাকেই বেশি আদর করতেন। হয়তো সে কারণেই আমার সব মেনে নিতেন।’

কারণ যেটাই হোক, মাগুরায় শিরিন আক্তার নামে এক ভদ্রমহিলা তাঁর ছেলের মাঠে যাওয়ার পথ সুগম করে দিতেন। খেলতে খেলতে সেই ছেলেই আজকের সাকিব আল হাসান এবং আমাদের কাছে এটুকুই যথেষ্ট। সেদিন মা-ও যদি সাকিবের খেলায় বাধা হয়ে দাঁড়াতেন, আজকের সাকিবকে বাংলাদেশ না-ও পেতে পারত। এ দেশের ক্রিকেটে নিজের অজান্তেই অসামান্য এক অবদান রেখে দিলেন সাকিবের রত্নগর্ভা মা। তাঁর সন্তানও স্বীকার করেন, ‘আমার খেলোয়াড় হওয়ার পেছনে মায়ের ভূমিকা অনেক। ছোটবেলায় খেলতে যাওয়ার ওই স্বাধীনতাটাও ছিল বিরাট সাপোর্ট।’

মায়ের জন্য সাকিবের টানের কথাও একটু শুনুন। আইপিএলে শুরুর দিকের ঘটনা। কলকাতায় বসে শুনলেন মায়ের খুব জ্বর। এমনই খারাপ অবস্থা যে হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি হতে হয়েছে। দুঃসংবাদটা শোনার পর আর দেরি করেননি। টিম ম্যানেজমেন্টকে জানিয়ে ঘণ্টা তিনেকের মধ্যে ধরেন দেশের বিমান।

মায়ের ভূমিকা সাকিবের প্রতিটি কাজে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে। সাকিব বিকেএসপিতে পড়ায় ছেলেকে লম্বা সময় না দেখে থাকতে অভ্যস্ত শিরিন আক্তার। তবু সাকিব এখনো মাগুরায় গেলে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তাঁর খাওয়াদাওয়া নিয়ে। অথচ সেদিনের সেই ছোট্ট সাকিব আজ নিজেই একজন বাবা!

মায়ের স্নেহের আঁচলের ছায়া অবশ্য কোনো সন্তানই হারাতে চায় না। সাকিব তো আরও এক ডিগ্রি ওপরে। নিজে তো আছেনই, স্ত্রী শিশিরের পর মেয়ে আলায়নাকেও নিয়ে এসেছেন সেই আঁচলতলে। সর্বশেষ নিউজিল্যান্ড সফরের মাঝে সাকিবের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন স্ত্রী। কিন্তু মেয়ে আলায়না ছিল ঢাকাতেই, দাদির কাছে।

পেশাদার খেলোয়াড় সাকিব আজ ইন্ডিয়ায় তো কাল থাকেন ইংল্যান্ডে। তবু স্ত্রী-কন্যা নিয়ে তাঁর দুশ্চিন্তা অর্ধেক কমে গেছে শুধু মা পরিবারের কাছে থাকায়। নাতনিকে দেখভালের কাজে দাদির অপরিসীম ধৈর্য দেখে আলায়নার বাবা একটু অবাকই হন, ‘বাচ্চাকে আমার সময় দেওয়া হয় খুব কম। ঘরে থাকলে ওর সঙ্গে খেলি, এটুকুই। দাদি-নানিরাই রাখেন। এখন যেহেতু তার নানি দেশে নেই, আম্মাই রাখেন বেশির ভাগ সময়। কীভাবে যে মানুষের এত ধৈর্য থাকে!’

গত বছর আইপিএলের সময় মাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। এবার নিয়ে গেছেন শ্রীলঙ্কায়। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সময় ছেলে আর তাঁর পরিবারের সঙ্গে শিরিন আক্তার সম্ভবত ইংল্যান্ডেও যাবেন।

কে জানে, সাকিবও হয়তো স্বপ্ন দেখেন—একটা পৃথিবী চাই মায়ের আঁচলের মতো।

READ : 409 times

এইদিনে