তিস্তা জলচুক্তি নিয়ে ফের আশার আলো

শহিদুল হাসান খোকন: | 2018/04/20 | 14:25

বাংলাদেশ মনে করে, হাসিনা-মোদী সরকারের আমলেই তিস্তা সমস্যা মিটবে

ইন্ডিয়া টুডে গ্রুপের অনলাইন বাংলা প্রকাশনা Daily O এর সৌজন্যে


গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বৃহস্পতিবার লন্ডনে বিশেষ বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকে রোহিঙ্গা ও তিস্তা ইস্যু এবং পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালরয়ে নির্মাণাধীন বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধন-সহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

বৈঠকের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর ব্যক্তিগত টুইটার অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক আরও জোরদার করতে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।ভারতের বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র রবীশ কুমারের টুইট বার্তাকে উদ্ধৃত করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম তাঁর টুইট বার্তায় শেখ হাসিনা ও মোদীর বৈঠকের ব্যাপারে লিখেছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার বাংলাদেশকে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে মন্তব্য করেছেন। দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

 

Held wide-ranging talks with PM Sheikh Hasina on ways to further cement India-Bangladesh relations. pic.twitter.com/2wGPPXQfQx

— Narendra Modi (@narendramodi) April 19, 2018

 

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কমনওয়েলথ সদস্য দেশগুলোর সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের পঁচিশতম শীর্ষ সম্মেলনে এখন লন্ডন রয়েছেন। এই সম্মেলনকে ঘিরে আগে থেকেই দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠেকর আভাস দিয়েছিল দু’দেশের গণমাধ্যম। এই বৈঠক নিয়ে গণমাধ্যম-সহ সাধারণ মানুষের বিশেষ নজর ছিল দুই বন্ধুদেশের মধ্যে অমীমাংসিত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি।

এর আগে গত ২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকালে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে আশ্বস্ত করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অমতের কারণে তা হয়নি। তার আগে গত ২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশ সফরে এসেও তিস্তা ইস্যুর ইতিবাচক সমাধানের কথা বলেছিলেন। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় দু'দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়টি। স্বাভাবিক ভাবেই এ সংবাদ বাংলাদেশের কাছে এক সুখকর ও আশার খবর হিসেবেই গণমাধ্যমে উপস্থাপন হয়েছে।

তিস্তা ও প্রাসঙ্গিক কিছু আলোচনা

বাংলাদেশ ও ভারতের ৫৪টি আন্তর্জাতিক নদী রয়েছে। এ নদীগুলোর মধ্যে গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে। অবশিষ্ট নদীগুলোর মধ্যে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তিটি চূড়ান্ত হলেও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের আপত্তির কারণে দীর্ঘদিন তা ঝুলে আছে। ভারতের কংগ্রেস দলীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ২০১১ সালে এবং বিজেপি দলীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২০১৫ সালে ঢাকা সফরকালীন তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। কিন্তু উভয় সফরের সময় দেখা গেল পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘোরতর আপত্তির কারণ দেখিয়ে ভারতের উভয় প্রধানমন্ত্রী চুক্তি স্বাক্ষর থেকে বিরত রইলেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, শুষ্ক মরসুমে তিস্তা নদীর পানির যে প্রবাহ থাকে তা তার রাজ্যের পানির চাহিদা মেটানোর জন্য অপ্রতুল। এ অবস্থায় তার রাজ্যের পানির চাহিদা অপূর্ণ রেখে তার পক্ষে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের এ চুক্তি স্বাক্ষরে সমর্থন দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ভারত সফরের সময় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ২২টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও দীর্ঘ প্রতীক্ষিত তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের প্রতিবন্ধকতা দূর হয়নি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরকালীন, তাঁর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হলেও, তা চুক্তি স্বাক্ষরে কোনও অগ্রগতি ঘটাতে পারেনি। সাক্ষাৎকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ভাবে বলা হয়, তিস্তানদীর পানির দাবি পরিহারপূর্বক বাংলাদেশ যেন তোর্সা-সহ মোট তিনটি নদীর পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা করে।

রাজ্য সরকার না চাইলে তবে কি হবে না তিস্তার পানিবন্টন চুক্তি? ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, কোনও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রীয় সরকারের আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরের পথে অন্তরায় সৃষ্টিকরতে পারেন কিনা? ভারতের সংবিধানের ২৪৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পানি রাজ্য সরকারের বিষয় হলেও সেটি দেশটির এক রাজ্যের সঙ্গে অপর রাজ্যের অভ্যন্তরীণ পানিবণ্টন, আহরণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ভারতের সংবিধানের ২৫৩ নং অনুচ্ছেদে আন্তর্জাতিক চুক্তির বিষয়ে যে বিধানাবলির উল্লেখ রয়েছে, তাতে বলা হয়েছে, অন্য কোনও দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের রয়েছে। সুতরাং ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার চাইলে সে দেশের সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ চুক্তি হতে পারে।

তিস্তার ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক

তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। সিকিমস্থ হিমালয় পর্বতমালার পাহুন্দ্রী হিমবাহ থেকে এটির উৎপত্তি হয়েছে। এ নদীটি ৩১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং এর অববাহিকার ১১৫ কিলোমিটার বাংলাদেশের অভ্যন্তর দিয়ে বয়ে গেছে। ভারত এ নদীটির উজানে গজলডোবায় বাঁধ দেওয়ায় এবং বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ ও সেচ প্রকল্প করায় নদীটি থেকে একতরফা ভাবে পানি তুলে নেওয়ায় নদীটির বাংলাদেশ অংশের বিস্তীর্ণ অংশ পলি জমে ভরাট হয়ে ক্ষীণাকৃতি ধারণ করেছে। নদীটির এমন অনেক অংশ আছে যা শুষ্ক মরসুমে সম্পূর্ণ পানিশূন্য থাকে। এ অবস্থায় নদীটি যে অচিরেই মরা নদীর আকার লাভ করবে সে বিষয়ে কোনও সংশয় নেই।

আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী একাধিক দেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত নদীর ক্ষেত্রে সব অববাহিকার দেশ পানির সুষম বণ্টনের দাবিদার। তিস্তার ক্ষেত্রে এটি চরম ভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। যে কোনও আন্তর্জাতিক নদীর পানির সুষম বণ্টন দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হলে তা আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় সুরাহার বিধান রয়েছে।

ইতিহাসের আলোকপাত

বাংলাদেশ ও ভারত ১৯৭২ সালে যৌথ নদী কমিশন গঠন করলেও আলোচনা আর বৈঠকের পর বৈঠকেও সমাধান হচ্ছে না তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি। পানিশূন্য তিস্তায় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে তিস্তাপাড়ের মানুষের জীবনযাত্রায়। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে পরিবেশ-প্রকৃতি। ১৯৮৭ সালের আগে পর্যন্ত তিস্তা ছিল উত্তরবঙ্গের প্রধান নদী। এই নদীর প্রবাহের ফলে উত্তরবঙ্গের প্রকৃতি ছিল শীতল, শান্ত ও মায়াময়। জলবায়ু ছিল অতীব সহনীয়। কিন্তু পানি বণ্টনের ব্যাপারে ভারতের ঢিলেমিতে তিস্তা তীরবর্তী ও আশপাশের প্রকৃতি রুক্ষ হয়ে উঠেছে। তলদেশে অজস্র পাথর, নুড়ি, বালি আর পলি পড়ে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার বুক জুড়ে থাকে বালি আর বালি। অন্যদিকে বর্ষাকালে মূল গতিপথ বদলে তিস্তা প্রচণ্ড বেগে আছড়ে পড়ে দুই তীরে। ফলে নির্দয় ভাঙনে প্রতি বছর বাড়িঘর, গাছপালা, আবাদি জমি হারিয়ে পথে বসেন ২০ হাজার মানুষ। সরকারি বিভিন্ন নথিপত্র অনুযায়ী জানা যায়, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ নদী কমিশন গঠনের পর তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে দুই দেশের মন্ত্রিপরিষদের এক বৈঠকে তিস্তার পানিবণ্টনে শতকরা ৩৬ ভাগ বাংলাদেশ ও ৩৯ ভাগ ভারত এবং ২৫ ভাগ নদীর জন্য সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু ওই সিদ্ধান্তে তিস্তার পানিপ্রবাহের পরিমাণ, কোন কোন জায়গায় পানি ভাগাভাগি হবে- এসব বিষয় উল্লেখ না থাকায় তা আর আলোর মুখ দেখেনি।

২০০৭ সালের ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে বাংলাদেশ তিস্তার পানির ৮০ ভাগ দুই দেশের মধ্যে বণ্টন করে বাকি ২০ ভাগ নদীর জন্য রেখে দেয়ার জন্য প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ভারত সেই প্রস্তাব গ্রহণ না করে উল্টে তিস্তার কমান্ড এরিয়া তাদের বেশি- এই দাবি তুলে বাংলাদেশ তিস্তার পানির সমান ভাগ পেতে পারে না বলে যুক্তি দেখায়। শুধু তাই নয়, ভারত তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের সেচ এলাকা কমিয়ে দ্বিতীয় প্রকল্প বাতিল করার জন্য চাপ দেয়। পরবর্তী সময়ে ভারত এক চিঠিতে তিস্তার মাত্র ২০ ভাগ পানি ভাগাভাগি করার বিষয়টিও জানিয়ে দেয়। ফলে শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্য হয়ে তিস্তা হয়ে যায় মরুভূমি। আর কারণে-অকারণে বর্ষাকালে গাজলডোবার গেট খুলে তিস্তায় পানি ছেড়ে দিলে বন্যায় তিস্তার তীর ও আশপাশের অর্ধকোটি মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের থাবায় বিপর্যস্ত এখন এই অঞ্চলের প্রকৃতি। আর মানুষ যুদ্ধ করছে বিবর্ণ কষ্টের সঙ্গে প্রতিদিন। বাংলাদেশের এই অঞ্চলের মানুষের জলবায়ুর বিপর্যয় ঠেকাতে এবং লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্নে তিস্তার পানিবন্টন চুক্তি অতি জরুরি হয়ে পড়েছে।

নতুন আশায় বেঁধেছি বুক

তিস্তা নিয়ে দু'দেশের বর্তমান সরকারের প্রত্যাশার বেলুন আকাশচুম্বী, এটা এক কথায় বলা যায় পারিপার্শ্বিক কার্যকারণ বিশ্লেষণ করে। দু'দেশের দুই প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতায় সুখে-দুঃখে পাশাপাশি অবস্থান করছেন। ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ তাঁর বাংলাদেশ সফরে স্পষ্ট করে বলেছেন, সকল বন্ধুর মাঝে ভারত সবচেয়ে বাংলাদেশকেই বেশি প্রাধান্য দিতে চায়। বাংলাদশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশীদার মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিভিন্ন ইস্যু সমাধান করেছেন। বিশেষ করে ছিটমহল বিনিময় চুক্তি দু'দেশেই ব্যাপক প্রসংশিত হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বাস করে, হাসিনা-মোদী সরকারের আমলেই তিস্তা সমস্যার সমাধান হবে।
 

[লেখক:
শহিদুল হাসান খোকন
Bangladesh Correspondent, TV Today.]

READ : 368 times

এইদিনে