অনন্ত জলিল, আপনাকে ধন্যবাদ

নিউজ ডেস্ক | 2018/04/19 | 14:00

ঢাকা যে নগর হিসেবে কতখানি অনিরাপদ তার বড় প্রমাণ তিতুমির কলেজের ছাত্র রাজীবের নিষ্ঠুর মৃত্যু। ছেলেটি প্রতিদিনের মত বাসে করে যাচ্ছিল। দুই বাস চালকের দানবীয় প্রতিযোগিতায় হাত ছিঁড়ে যায় রাজীবের। রাজিব অবশেষে মৃত্যুবরণ করে। রাজীব মারা যাওয়ায় অথৈ সাগরে পড়েছে তার দুই ভাই। এরা এখনো ছাত্র। রাজীব নিজে কাজ করে নিজের এবং এদের পড়াশুনার খরচ যোগাত। সবাই আফসোস করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছে । কিন্তু প্রশাসন বা কোনো ব্যক্তি, কেউ রাজীবের ভাইদের সহায়তায় এগিয়ে আসেননি। শেষ পর্যন্ত এগিয়ে এসেছেন বাংলাদেশের আলোচিত-সমালোচিত ‘নায়ক ‘অনন্ত জলিল।

অনন্ত জলিলকে নিয়ে অনেক সমালোচনা করি আমরা অনেকেই। উচ্চারণ, দেহশৈলী, ইত্যাদি নানা কারণেই আমরা তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করি। তবে আমাদের কিছু লোকের হাসাহাসি সত্ত্বেও অনন্ত জলিলের ভক্ত সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। মানুষ হিসেবে তিনি যে দায়িত্বশীল, সেটার প্রমাণ আবার রাখলেন তিনি। দুই বাসের চাপে পড়ে হাত হারানো, অতপর নিহত রাজীবের দুই ভাই এর যাবতীয় খরচ তিনি বহন করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন মঙ্গলবার রাতে।

চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ এবং অভিনয় করার পাশাপাশি অনন্ত জলিল গার্মেন্টস ব্যবসা করেন বলে আমরা জানি। অভিনয় এবং ব্যবসা করলেও ইদানিং পবিত্র ইসলাম ধর্মের প্রচারের কাজেও সময় দিচ্ছেন, তাবলীগ জামাতের একজন সদস্য হিসেবে কাজ করছেন তিনি। অনন্ত জলিল এর অভিনয় দক্ষতা নিয়ে সমঝদার সমাজের বেশ সমালোচনা থাকলেও তিনি যে একজন ‘ভালো’ মানুষ তার কিছু প্রমাণ ব্যবসায়ী পরিচয় থেকেও পাই। আমরা শুনেছি, তিনি তার গার্মেন্টস কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের অধিকার বিষয়ে খুব সচেতন। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের প্রতি উনি যে আচরণ প্রদর্শন করেন সেটি শিক্ষণীয়। আমরা শুনেছি, অনন্ত জলিল তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন বেতনসহ ছুটি দিয়ে থাকেন। সব শ্রমিককে নিয়মিত বেতন, বোনাস দেয়া হয়।

কর্মজীবী নারীদের জন্য ৬ মাসের বেতনসহ ছুটি প্রদানের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত  সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে অনুসরণ করা হলেও দেশের বেসরকারি খাতের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে এই নিয়ম অনুসরণ করা হয় না। এমন কি, ঢাকার বড় বড় মিডিয়া হাউজেও নারী কর্মীদের প্রতি অবিচার করা হয়। মেয়েরা সন্তান সম্ভাবা হলে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হয়, অথবা বেতন ছাড়া ছুটি দেয়া হয়। অনেকে ছুটি কাটিয়ে এসে দেখে তার চাকরি নেই! যেসব প্রতিষ্ঠান মাতৃত্বকালীন ছুটি দেয়, এরাও পুরোটা দেয় না, কয়েক সপ্তাহের দেয়া হয় মাত্র। অথচ আমরা জানি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত উদ্যোগে নারীদের জন্য ৬ মাসের বেতনসহ ছুটি দেয়ার আইন করা হয়। আগে ছিল মাত্র তিন মাসের।

দেশের অনেক গার্মেন্টস কারখানায়ও শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি দেয়া হয় না। শ্রমিকরা সহিংস হয়ে নিজ প্রতিষ্ঠানেই হামলা চালায়। এখানেও নাকি ব্যতিক্রম অনন্ত জলিল। শ্রমিকরা অনন্ত জলিলকে এতটাই ভালোবাসে যে, যে কোনো ভাঙচুরের সময় নিজেরা লাঠি হাতে কারখানা পাহারা দেয়। মালিক-শ্রমিকের সম্পর্ক ভালো থাকলে যে উৎপাদন ব্যবস্থা এবং ব্যবস্থাপনা ভালো হয় তার উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন অনন্ত জলিল।

রাজীব যেভাবে নিজের হাত হারালেন এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন তাতে প্রতিটি মানবিক মানুষের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠেছে। রাজীবের সম্ভবত বাবা-মাও নেই । ছিল দুই ভাই, যাদের পড়াশুনার খরচ রাজীব দিত। রাজীব ছাত্র হয়ে নিজের এবং দুই ভাইয়ের সব খরচ যোগানোর চেষ্টা করত। অথচ রাজীব আজ পৃথিবীতে নেই। খুব কষ্ট পেয়ে এই পৃথিবী থেকে চলে গেছে সে। রাজীব দেখিয়ে দিয়ে গেছে এই ঢাকা শহর একটা মৃত্যু ফাঁদ। গণপরিবহন ব্যবস্থা খুবই নিম্নমানের। বাস থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়া, বাসের ভেতরে ধর্ষণ করা, গাদাগাদি করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসে দাঁড়িয়ে থাকা, প্রাইভেট কার আর রিক্সার বাড়াবাড়ি ইত্যাদি নানা বৈশিষ্ট্য দিয়ে ঢাকার গণপরিবহনকে আমরা উপস্থাপন করতে পারি।

আমরা আশা করেছিলাম , সরকারি প্রশাসন এত ভয়ংকর একটা দুর্ঘটনার পর গণপরিবহন নৈরাজ্য দূরীকরণে নিজের তৎপরতা দেখাবে। অন্তত রাজীবের অসহায় দুই ভাই এর পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু কাউকে এগিয়ে আসতে দেখলাম না। অবশেষে অনন্ত জলিল এগিয়ে এসে সবার মুখরক্ষা করলেন। আপন বড় ভাই হারানোর কষ্ট ছোট দুইজন কখনোই ভুলবে না। কিন্তু অনন্ত জলিল নিজের কথা অনুযায়ী সহায়তা অব্যাহত রাখলে হয়ত সামনে একটু আশার আলো দেখতে পাবে। এভাবে সব অবস্থাসম্পন্নরা যদি অসহায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়ান, তাহলে অনেক কষ্ট থেকে মানুষগুলো মুক্তি পায়।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়   

READ : 1217 times

এইদিনে