৫৭ ধারায় বাকস্বাধীনতা হরণের উপায় ছিল, স্বীকার করলেন আইনমন্ত্রী

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক | 2018/01/30 | 13:57

তথ্যপ্রযুক্তি আইন থেকে ৫৭ ধারা সরিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বিশদ আকারে যোগ করার প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক স্বীকার করে নিলেন, বিতর্কিত ওই ধারা বাকস্বাধীনতা হরণ করার ‘একটি উপায়’ ছিল।

তিনি দাবি করেছেন, ওই ধারার বিষয়বস্তু প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে যুক্ত করা হলেও তাতে বাক বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করা হয়নি। ৫৭ ধারার যে ‘অপপ্রয়োগ’ হচ্ছিল, নতুন আইন হলে তা বন্ধ হবে।

দুর্নীতির কোনো খবর প্রকাশ করলে সেটা গুপ্তচরবৃত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে না বলেও সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করেছেন আইনমন্ত্রী।

মঙ্গলবার সবিচালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, “এই যে ৫৭ ধারা যেটা ছিল, সেটার মধ্যে কোনো কিছু না করলেও আপনাকে আমি যদি পুলিশ হই আমি এটার মধ্যে ভরে দিতে পারব।

“… (আইসিটি আইন) ২০০৬ সালে করা হয়েছিল, এটা কিছুট হলেও বাকস্বাধীনতা হরণ করার একটা উপায় ছিল। এখানে (ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন) স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। বাকস্বাধীনতা হরণ করার চেষ্টাও (এখানে) করা হয় নাই এবং এই আইন বাকস্বাধীনতা কারও হরণ হয় নাই।”

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে করা তথ্য-প্রযুক্তি আইন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০০৯ ও ২০১৩ সালে দুই দফা সংশোধন করা হলেও ৫৭ ধারা বাদ না দিয়ে আইনে সাজার পরিমাণ ১০ বছর থেকে বাড়িয়ে করা হয় ১৪ বছর।

জামিন অযোগ্য ৫৭ ধারাকে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থি দাবি করে সেটি বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিলেন গণমাধ্যম ও মানবাধিকার কর্মীরা।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলে আসছিলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন হয়ে গেলে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা নিয়ে ‘বিভ্রান্তি’ দূর হয়ে যাবে।

সেই ৫৭ ধারাসহ কয়েকটি ধারা তথ্য প্রযুক্তি আইন থেকে সরিয়ে আরও বিশদ আকারে যুক্ত করে সোমবার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা।

এ আইন পাস হলে হ্যাকিং; ডিজিটাল মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতার বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচার’; রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিপন্ন করতে বা ভয়ভীতি সৃষ্টির জন্য কম্পিউটার বা ইন্টারনেট নেটওয়ার্কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং ডিজিটাল উপায়ে গুপ্তচরবৃত্তির মত অপরাধে ১৪ বছরের কারাদাণ্ডের পাশাপাশি কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে।

ইন্টারনেটে কোনো প্রচার বা প্রকাশের মাধ্যমে ‘ধর্মীয় অনুভূতি বা মূল্যবোধে আঘাত’ করার শাস্তি হবে ১০ বছরের জেল, ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড।

আইনমন্ত্রী দাবি করেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বিভিন্ন অপরাধ সংজ্ঞায়িত করে আরও স্পষ্ট করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনের একটি ধারায় বলা হয়েছে, সরকারি গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত ডিজিটাল উপায়ে ধারণ, স্থানান্তর বা সংরক্ষণ করা এবং তাতে সহয়তাকে গুপ্তচারবৃত্তির অপরাধ হিসেবে গণ্য করে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া যাবে। 

ফলে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার মতই এ আইন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধে ব্যবহার করা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে।

এ বিষয়ে আইনমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা পড়ে শোনান।

সেখানে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেউ পড়লে, দেখলে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন অথবা যার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি প্রদান করা হয়, তাহলে এ কাজ অপরাধ বলে গণ্য হবে।

মন্ত্রী বলেন, “এটা পড়লে মনে হয় পৃথিবীর যত অপরাধ সব একটার মধ্যে আনা হয়েছে।… অস্পষ্টতা যেটা ছিল সেটার কথা আমি বলছি,… আপনাদের যে শঙ্কা ছিল ৫৭ ধারাটা অস্পষ্ট এবং যে কোনো ছোটখাট অপরাধ করলেও এটার মধ্যে… এমনভাবে ভাষাটা করা হয়েছে যে এটার মধ্যে এনে ন্যূনতম সাত বছর সাজা দেওয়া যেতে পারে। এই আপত্তির আলোকেই আমরা আশ্বাস দিয়েছিলাম, আইসিটি আইন থেকে ৫৭ ধারা বিলুপ্ত হবে।”

তিনি বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংসদে পাস হলেই আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বিলুপ্ত হবে।

“… কম্পিউটার দ্বারা যেসব অপরাধ আগে পেনাল কোডে ছিল, সেগুলো যদি যান্ত্রিকভাবে করা হয়, সেগুলোকে অপরাধ গণ্য করে আমরা স্পষ্ট করে দিয়েছি। ৫৭ ধারায় সাত বছরের নিচে কোনো সাজা ছিল না। এটার মধ্যে আমরা তিন বছর করে দিয়েছি।

“আমাদের ইচ্ছা ৫৭ ধারার অপপ্রয়োগ বন্ধ করা। আমাদের বিশ্বাস, এই আইনের স্পষ্টতার কারণে ৫৭ ধারার যে অপপ্রয়োগ হচ্ছিল সেটা বন্ধ হবে।”

‘গুপ্তচরবৃত্তি’

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, গুপ্তচরবৃত্তিকে আগে থেকেই আইনে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।

“আমরা যেটা করেছি, ওই যে কম্পিউটার সিস্টেম বা ইনফরমেশন টেকনোলজির মধ্যে কেউ যদি গুপ্তচরবৃত্তি করেন, তাহলে সেটাকে অপরাধ বলে ধরা হয়েছে। সেটার সাথে সাংবাদিকতার কোনো সম্পর্ক আছে বলে আমার মনে হয় না। আমার মনে হয় এটা অহেতুক ভীতি আর সমালোচনার জন্য সমালোচনা করা।”

আনিসুল হক বলেন, “অহেতুক, অযথা কারও হয়রানি হোক প্রধানমন্ত্রী তা চান না, সেজন্য কোনো আইনের মধ্যেও সে রকম কোনো ব্যবস্থা থাক. তিনি চান নাই। সেই কারণে স্পষ্ট করেই এই ধারাগুলো দেওয়া হয়েছে।”

সম্প্রচার আইন পাস হওয়ার পর সাংবাদিকদের কেউ অহেতুক হয়রানি করতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সাংবাদিকদের কোন কোন কার্যক্রম গুপ্তচরবৃত্তির মধ্যে পড়বে না- সেই ব্যাখ্যা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, “আপনি যদি ইলিগ্যাল কোনো জিনিসের কথা ছাপিয়ে দেন যে, কেউ চুরি করছে- সেটি অপরাধ হতে পারে না। কোনো বইতে নাই যে সেটা অপরাধ। কম্পিউটারের মধ্যে থাকলেও সেটা যদি ইলিগ্যাল হয়, আর আপনি যদি প্রকাশ করেন, সেটা অপরাধ হতে পারে না।”

আনিসুল হক বলেন, অপরাধ করার জন্য যদি গোপন কোনো ষড়যন্ত্র হয়, আর সাংবাদিকরা যদি তা প্রকাশ করে দেয়, সেটা অপরাধ হবে না। কোথাও কোনো অপরাধ হলে, সাংবাদিক তা ধারণ করলে, প্রকাশ করলে এবং তার হাতে তথ্য-উপাত্ত থাকলে তা অপরাধ বিবেচিত হবে না।

তবে রাষ্ট্রীয় গোপনীয় তথ্যের বিষয়ে নিয়মের কথা সাংবাদিকদের মনে করিয়ে দেন আইনমন্ত্রী।

“অতি গোপনীয় জিনিসটা যদি সঠিক হয়, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যদি অতি গোপনীয় রাখতে চায় সেটা তো আপনাদের প্রকাশ করা ঠিক হবে না। কারণ এটা অপরাধ, আগেও ছিল, এখনও আছে।

READ : 216 times

এইদিনে